বর্তমানে সারাবিশ্বে মুসলমানের সংখ্যা আড়াইশো কোটিরও বেশী। পৃথিবীর প্রত্যেক তিনজন ব্যাক্তির মধ্যে একজন মুসলমান। অমুসলিমদের কাছে আমরা অর্থাৎ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা মুসলমান বলে পরিচিত হলেও মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে অনেক নামে পরিচিত। যেমন, হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী প্রভৃতি। এই নাম গুলি আল্লাহ বা মুহাম্মাদ (সঃ) এর দেওয়া নয় এমনকি যাঁদের নামে এই মাযহাব তৈরি করা হয়েছে তারাও এই নাম গুলো দেয়নি।
মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত চারটি মাযহাব, দল বা ফিকাহ ইসলামের কোনো নিয়ম বা বিধান মেনে তৈরি করা হয়নি। কারন ইসলাম ধর্মে কোনো দলবাজী বা ফিরকাবন্দী নেই। মুসলমানদের বিভক্ত হওয়া থেকে এবং ধর্মে নানা মতের সৃষ্টি করা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করা হয়েছে। এই মাযহাবগুলো রাসুল (সঃ) এবং সাহাবাদের (রাঃ) সময় সৃষ্টি হয়নি । এমনকি ঈমামগনের সময়ও হয়নি।
চার ইমামের মৃত্যুর অনেক বছর পরে তাঁদের নামে মাযহাব তৈরি হয়েছে। কোরআন হাদীস ও চার ইমামের দৃষ্টিতে মাযহাব কি, কেন, মাযহাব কি মানতেই হবে, মাযহাব মানলে কি গোনাহ হবে, সে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করব ইনশাল্লাহ্!
মাযহাব তৈরিতে আল্লাহর কঠোর নিষেধাজ্ঞা :
মুসলমানেরা যাতে বিভিন্ন দলে আলাদা বা বিভক্ত না হয়ে যায় সে জন্য আল্লাহ পাক আমাদের কঠোরভাবে সাবধান করেছেন। যেমন আল্লাহ তা’আলা কুরআনের সূরা আন-আমর এর ১৫৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন,
“যারা দ্বীন সন্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন, দলে বিভক্ত হয়েছে হে নবী! তাদের সাথে তোমার কোনও সম্পর্ক নেই; তাদের বিষয় আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবগত করবেন।”
একটু থামুন। উপরের আয়াতটা দয়া করে বারবার পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন, চিন্তা করুন। আল্লাহ তা’আলা সরাসরি বলেছেন যারা দ্বীন বা ধর্মে অর্থাৎ ইসলামে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভক্ত হয়েছে, তাদের সাথে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কোনো সম্পর্ক নেই ।
যার সাথে নবীজীর (সা) কোনো সম্পর্ক নেই সে কি মুসলমান? সে কি কখনো জান্নাতের গন্ধও পাবে। আমরা মুসলমান কোরআন হাদীস মাননে ওয়ালা এটাই আমাদের একমাত্র পরিচয়। আল্লাহ বলেন, এবং তোমাদের এই যে জাতি, এতো একই জাতি; এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক, অতএব আমাকে ভয় করো। (সূরা মু’মিনুন ২৩/৫২)। তাহলেই বুঝতেই পেড়েছেন ফরয, ওয়াজীব ভেবে আপনারা যা মেনে চলছেন আল্লাহ তা মানতে কত কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন তবে শুধু এইটুকুই নয় আল্লাহ আরও অনেক আয়াতে এ ব্যাপারে মানুষকে সাবধানবানী শুনিয়েছেন । যেমন সূরা রূমের একটি আয়াত দেখুন যেখানে আল্লাহ পাক বলছেন
‘..... তোমরা ঐ সকল মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা নিজেদের দ্বীনকে শতধা বিচ্ছিন্ন করে বহু দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দল নিজেদের কাছে যা আছে তা নিয়ে খুশি’ – (সূরা রুম ৩০/৩১-৩২)।
বর্তমানে আমাদের সমাজের অবস্থাও ঐ মুশরিকদের মতো। ইসলামকে তারা (মাযহাবীরা) বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছে এবং তাদের নিজেদের কাছে যা আছে তা নিয়েই তারা খুশি । তাদের সামনে কোনো কথা উপস্থাপন করলে তারা বলেনা যে কুরআন হাদীসে আছে কি না । তারা বলে আমাদের ইমাম কি বলেছে । এরা কুরআন হাদীসের থেকেও ইমামের ফিকাহকে অধিক গুরুত্ব দেয় । অথচ ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে কুরআন হাদীস। তা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
উপরের আয়াতে আল্লাহ তা’আলা আমাদের উপদেশ দিয়েছেন তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না; তোমরা ইসলামে মাযহাবের সৃষ্টি করো না। অথচ আমরা কুরআনের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে দ্বীনে দলের সৃষ্টি করেছি এবং নিজেকে হানাফী, মালেকী বা শাফেরী বলতে গর্ব অনুভব করছি। আল্লাহ বলেন ‘হে ইমানদারগন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রগামী হয়ো না, এবং আল্লাহকে ভয় করো; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী’
ইমামরা মাযহাব সৃষ্টি করেননি :
ভারতবর্ষের বিখ্যাত হাদীসশাস্ত্রবিদ ও হানাফীদের শিক্ষাগুরু যাকে হানাফীরা ভারতবর্ষের ‘ইমাম বুখারী’ বলে থাকেন সেই শাহ আলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহেলভী (রহ) বলেছেন – ‘ই’লাম আন্না না-সা-কা-নু ক্কারলাল মিআতির রা-বিআতি গাইরা মুজমিয়ীনা আলাত্-তাকলীদিল খা-লিস লিমায় হাবিন্ ওয়া-হিদিন্ বি-আইনিহী’ অর্থাৎ তোমরা জেনে রাখো যে, ৪০০ হিজরীর আগে লোকেরা কোন একটি বিশেষ মাযহাবের উপর জমে ছিল না । (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ; ১৫২ পৃষ্ঠা)। অর্থাৎ ৪০০ হিজরীর আগে নিজেকে হানাফী, শাফেয়ী বা মালেকী বলে পরিচয় দিতো না। আর চারশো হিজরীর অনেক আগে ইমামরা ইন্তেকাল করেন। ইমামদের জন্ম ও মৃত্যুর সময়কালটা একবার জানা যাক তাহলে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে।
ইমামের নাম | জন্ম | মৃত্য |
| আবু হানীফা (রহ) | ৮০ হিজরী | ১৫০ হিজরী |
| ইমাম মালেক (রহ) | ৯৩ হিজরী | ১৭৯ হিজরী |
ইমাম শাফেয়ী (রহ) | ১৫০ হিজরী | ২০৪ হিজরী |
আহমদ বিন হাম্বাল(রহ) | ১৬৪ হিজরী | ২৪১ হিজরী |
বিশিষ্ট হানাফী বিদ্বান শাহ ওলিউল্লাহ দেহেলভী (রহ) এর কথা যদি মেনে নেওয়া যায় যে ৪০০ হিজরীর আগে কোনো মাযহাব ছিল না, এবং ৪০০ হিজরীর পরে মানুষেরা মাযহাব সৃষ্টি করেছে, তার মানে এটা দাঁড়ায় যে আবু হানীফার ইন্তেকালের ২৫০ বছর পর হানাফী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম মালেকের ইন্তেকালের ২২১ বছর পর মালেকী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম শাফেরীর ইন্তেকালের ১৯৬ বছর পরে শাফেয়ী মাযহাব এবং ইমাম আহমাদের ইন্তেকালের ১৫৯ বছর পর হাম্বলী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থাৎ ইমামদের জীবিত অবস্থায় মাযহাব সৃষ্টি হয়নি। তাঁদের মৃত্যুর অনেকদিন পরে মাযহাবের উদ্ভব হয়েছে। আর একবার চিন্তা করে দেখুন মাযহাব বা দল সৃষ্টি করাতে কোরআন ও হাদিসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মহামান্য ইমামরা ছিলেন কোরআন হাদীসের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসারী এবং ধর্মপ্রান মুসলিম। তাঁরা কি কোরআন হাদীসকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মাযহাব তৈরি করবেন যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, এটা কখনো হতে পারে? যারা বলে ইমামরা মাযহাব সৃষ্টি করেছেন তারা হয় মুর্খ নয় বেইমান। তারা ইমামদের প্রতি অপবাদ দেয়।
অর্থাৎ ইমামদের জীবিত অবস্থায় মাযহাব সৃষ্টি হয়নি। তাঁদের মৃত্যুর অনেকদিন পরে মাযহাবের উদ্ভব হয়েছে। আর একবার চিন্তা করে দেখুন মাযহাব বা দল সৃষ্টি করাতে কোরআন ও হাদিসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মহামান্য ইমামরা ছিলেন কোরআন হাদীসের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসারী এবং ধর্মপ্রান মুসলিম। তাঁরা কি কোরআন হাদীসকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মাযহাব তৈরি করবেন যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, এটা কখনো হতে পারে? যারা বলে ইমামরা মাযহাব সৃষ্টি করেছেন তারা হয় মুর্খ নয় বেইমান। তারা ইমামদের প্রতি অপবাদ দেয়।
মাযহাব সৃষ্টি হল কিভাবে :
ফারসীতে একটি প্রবাদ আছে ‘মান তোরা হাজী গো ইয়াম তু মোরা হাজী বোগো’ অর্থাৎ একজন লোক আর একজনকে বলছে, ভাই! যদিও তুমি হাজী নও তথাপি আমি তোমাকে হাজী সাহেব বলছি এবং যদিও আমি হাজী নই তুমি আমাকে হাজী সাহেব বলো। এভাবে একে অপরকে হাজী সাহেব বলে ডাকার ফলে আমরা দু-জনেই হাজী সাহেব হয়ে যাবো।
এভাবেই আবু হানীফার অনুসারীদের অথবা তাঁর ফতোয়া মান্যে ওয়ালাদের অন্যেরা হানাফী একইভাবে ইমাম মালেকের ফতোয়া মাননে ওয়ালাদের মালেকী বলে ডাকাডাকির ফলে মাযহাবের সৃষ্টি হয়েছে। আজ যা বিরাট আকার ধারন করেছে। আবু হানীফা (রহঃ) বা তাঁর শিষ্যরা কখনো বলেননি আমাদের ফতোয়া যারা মানবে তারা নিজেদের পরিচয় হানাফী বলে দিবে । অথবা ইমাম মালেক বা শাফেয়ীও বলে যাননি যে আমার অনুসারীরা নিজেকে মালেকী বা শাফেয়ী বলে পরিচয় দিবে । ইমামরা তো বটেই এমনকি ইমামদের শাগরেদরা কিংবা তাঁর শাগরেদদের শাগরেদরাও মাযহাব সৃষ্টি করতে বলেননি । যখন আমাদের মহামতি ইমামরা মাযহাব সৃষ্টি করেননি এবং করতেও বলেননি তখন উনাদের নামে মাযহাব সৃষ্টি করার অধিকার কে দিল?
হাদীস বিরোধী বক্তব্যের ব্যাপারে ইমামদের রায় :
মাযহাবীদের মধ্যে কিছু লোক দেখা যায় যারা ইমামদের তাক্কলীদ করে অর্থাৎ অন্ধ অনুসরন করে। তারা ইমামদের বক্তব্যকে আসমানী ওহীর মতো মানে। কোরআন-হাদিস বিরোধী কোনো রায় হলেও তাতে আমল করে। তাই সেই সব লোকদের জন্য হাদীস অনুসরনের ব্যাপারে ইমামদের মতামত এবং তাদের হাদীস বিরোধী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে তাদের কয়েকটি উক্তি দেওয়া হল। ইনশাল্লাহ্! মাযহাবী ভাইয়েরা এ থেকে অনেক উপকারিত হবেন ।
আবু হানীফা (রহ) :
১) যখন হাদীস সহীহ হবে, তখন সেটাই আমার মাযহাব অর্থাৎ হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব । (ইবনুল আবেদীন ১/৬৩; রাসমুল মুফতী ১/৪; ঈক্কামুল মুফতী ৬২ পৃষ্ঠা)
২) কারো জন্য আমাদের কথা মেনে নেওয়া বৈধ নয়; যতক্ষন না সে জেনেছে যে, আমরা তা কোথা থেকে গ্রহন করেছি। (হাশিয়া ইবনুল আবেদীন ২/২৯৩ রাসমুল মুফতী ২৯, ৩২ পৃষ্ঠা, শা’ রানীর মীথান ১/৫৫; ইলামুল মুওয়াক্কিঈন ২/৩০৯)
৩) যে ব্যাক্তি আমার দলিল জানে না, তার জন্য আমার উক্তি দ্বারা ফতোয়া দেওয়া হারাম । (আন-নাফিউল কাবীর ১৩৫ পৃষ্ঠা)
৪) আমরা তো মানুষ । আজ এক কথা বলি, আবার কাল তা প্রত্যাহার করে নিই ।
-(ঐ)
৫) যদি আমি এমন কথা বলি যা আল্লাহর কিবাব ও রাসুলের (সা) হাদীসের পরিপন্থি, তাহলে আমার কথাকে বর্জন করো । (দেওয়ালে ছুড়ে মারো)। (ঈক্কাবুল হিমাম ৫০ পৃষ্ঠা)
ইমাম মালেক :
১) আমি তো একজন মানুষ মাত্র। আমার কথা ভুল হতে পারে আবার ঠিকও হতে পারে। সুতরাং তোমরা আমার মতকে বিবেচনা করে দেখ। অতঃপর যেটা কিতাব ও সুন্নাহর অনুকুল পাও তা গ্রহন কর। আর যা কিতাব ও সুন্নাহর প্রতিকুল তা বর্জন করো । (জানেউ বায়ানিল ইলম ২/৩২, উসুলুল আহকাম ৬/১৪৯)
২) রাসুলুল্লাহ (সা) এর পর এমন কোনো ব্যাক্তি নেই যার কথা ও কাজ সমালোচনার উর্ধে । একমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা) ই সমালোচনার উর্ধে ।
(ইবনু আবদিল হাদী, ১ম খন্ড, ২২৭ পৃষ্ঠা, আল ফতোয়া – আসসাবকী, ১ম খন্ড ১৪৮ পৃষ্ঠা, উসুলুল আহকাম ইবনু হাযম, ষষ্ঠ খন্ড ১৪৫ – ১৭৯ পৃষ্ঠা)।
৩) ইবনু ওহাব বলেছেন, আমি ইমাম মালেককের উয়ব মধ্যে দুই পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার বিষয়ে এক প্রশ্ন করতে শুনেছি। তিনি বলেন লোকদের জন্য এটার প্রয়োজন নাই । ইবনু ওহাব বলেন, আমি মানুষ কমে গেলে তাঁকে নিরিবিলে পেয়ে বলি ‘তাতো আমাদের জন্য সুন্নাহ। ইমাম মালেক বলেন, সেটা কি? আমি বললাম, আমরা লাইস বিন সাদ, ইবনু লোহাইআ, আমর বিন হারেস, ইয়াবিদ বিন আমার আল-মা আফেরী, আবু আবদুর রহমান আল হাবালী এবং আল মোস্তাওরাদ বিন শাদ্দাদ আল কোরাশী এই সুত্র পরম্পরা থেকে জানতে পেরেছি যে, শাদ্দাদ আল কোরাশী বলেন, আমি রাসুল (সা) কে কনিষ্ঠ আঙ্গুল দিয়ে দুই পায়ের আঙ্গুল খেলাল করতে দেখেছি। ইমাম মালেক বলেন, এটা তো সুন্দর হাদীস। আমি এখন ছাড়া আর কখনো এই হাদীসটি শুনিনি। তারপর যখনই তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, তখনই তাঁকে পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার আদেশ দিতে আমি শুনেছি। (মোকাদ্দামা আল জারাহ ওয়াত তা দীল- ইবনু হাতেমঃ ৩১- ৩২ পৃষ্ঠা)
ইমাম শাফেয়ীঃ
১) হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব । (মাজমু ১/৬৩; শা’রানী ১/৫৭)
২) আমি যে কথাই বলি না কেন অথবা যে নীতিই প্রনয়ন করি না কেন, তা যদি আল্লাহর রাসুল (সা) এর নিকট থেকে বর্ণিত (হাদীসের) খিলাপ হয়, তাহলে সে কথাই মান্য, যা রাসুল (সা) বলেছেন। আর সেটাই আমার কথা ।
(তারীখু দিমাশ্ক; ইলামুল মুওয়াক্কিঈন ২/৩৬৬,৩৬৪)
৩) নিজ ছাত্র ইমাম আহমাদকে সম্বোধন করে বলেন, হাদীস ও রিজাল সম্বন্ধে তোমরা আমার চেয়ে বেশি জানো। অতএব হাদীস সহীহ হলে আমাকে জানাও, সে যাই হোক না কেন; কুকী, বাসরী অথবা শামী । তা সহীহ হলে সেটাই আমি আমার মাযহাব (পন্থা) বানিয়া নেবো । (ইবনু আবী হাতীম ৯৪-৯৫ পৃষ্ঠা; হিলয়াহ ৯/১০৬)
৪) আমার পুস্তকে যদি আল্লাহর রাসুল (সা) এর সুন্নাহের খেলাপ কে কথা পাও, তাহলে আল্লাহর রাসুল (সা) এর কথাকেই মেনে নিও এবং আমি যা বলেছি তা বর্জন করো । (নাওয়াবীর মা’জমু ১/৬৩; ইলামূল মুওয়াক্কিঈন ২/৩৬১)
৫) যে কথাই আমি বলি না কেন, তা যদি সহীহ সুন্নাহর পরিপন্থি হয়, তাহলে নবী (সা) এর হাদীসই অধিক মান্য। সুতরাং তোমরা আমার অন্ধানুকরন করো না।
(হাদীস ও সুন্নাহর মুল্যমান ৫৪ পৃষ্ঠা)
৬) নবী (সা) থেকে যে হাদীসই বর্ণিত হয়, সেটাই আমার কথা; যদিও তা আমার নিকট থেকে না শুনে থাকো। (ইবনু আবী হাতীম ৯৩-৯৪)
ইমামা আহমাদ :
১) তোমরা আমার অন্ধানুকরন করো না, মালেকেরও অন্ধানুকরন করো না। অন্ধানুকরন করো না শাফেরীর আর না আওয়ারী ও ষত্তরীব বরং তোমরা সেখান থেকে তোমরা গ্রহন কর যেখান থেকে তারা গ্রহন করেছেন। (ইলামুল মোয়াক্কিঈন ২/৩০২)
২) যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল (সা) এর হাদীস প্রত্যাখ্যান করে, সে ব্যক্তি ধ্বংসোন্মুখ । (ইবনুল জাওযী ১৮২ পৃষ্ঠা)
৩) আওযাঈ; ইমাম মালেক ও ইমাম আবু হানীফার রায় তাদের নিজস্ব রায় বা ইজতিহাদ। আমার কাছে এসবই সমান। তবে দলিল হল আসার অর্থাৎ সাহাবী ও তাবেঈগনের কথা। (ইবনু আবদিল বার-আল-জামে, ২ খন্ড, ১৪৯ পৃষ্ঠা)
ইমামদের এই সকল বক্তব্য জানার পর আমরা বলতে পারি প্রকৃতই যারা ইমামদের ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন, মান্য করেন তারা ইমামদের কথা অনুযায়ী চলবেন এবং সহীহ হাদীসকেই নিজের মাযহাব বানাবেন । তাক্কলীদ করবেন না । সরাসরী সেখান থেকে গ্রহন করবেন যেখান থেকে ইমামরা করেছেন অর্থাৎ সরাসরী হাদীস কোরআন থেকে । ইমামরা কোনো বিষয়ে ভুল ফতোয়া (সহীহ হাদীস তাঁদের কাছে না পৌছানোর কারনে) দিয়ে থাকলে তা প্রত্যাখ্যান করা এবং সহীহ হাদীসের উপর আমল করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলাম বোঝার ও সহীহ হাদীসের উপর আমল করার তৌফিক দিন। আমীন ।

আহলে হাদীসের বন্ধুরা দাবির উপর দাবি তোলে যে কুরআন এক হাদীস এক মাযহাব চারটা কেন?
ReplyDeleteউম্মতকে এক করার শ্লোগান দিয়ে জাতিকে ধোকাদিয়ে বুখা বানায়। অথচ তাদের ফেরকার কোন হিসাব নেই, তারাই আবার ঐক্যের শ্লোগান দিয়ে বেরায়। ১৩১৩ হিজরী থেকে ১৩৭৮ হিজরী পর্যন্ত শুধু ভারত বর্ষের ফেরকা গুলো -
(১) জামায়াতে গুরাবায়ে আহলে হাদীস।এই ফেরকার পতিষ্টা কালঃ ১৩১৩ হিজরী।
(১) আহলে হাদীস কনফারেন্স। এই ফেরকার
প্রতিষ্টা কালঃ ১৩২৮ হিজরী।
(৩) আমিরে শরিয়াত বিহার প্রদেশ।এই ফেরকার প্রঃলতিষ্ঠা কালঃ১৩৩৯হিজরী।
(৪)সুনাইয়্যাহ ফেরকা। এই ফেরকার প্রতিষ্টা কাল: ১৯৩৮ খৃ:।
(৫) ফেরকায় হানাফিয়াহ আতাইয়্যাহ। এ ফেরকার
প্রতিষ্ঠা কালঃ ১৯২৯খৃঃ।
(৬)ফেরকায়ে শারকিয়্যাহ ।প্রতিষ্ঠা কালঃ ১৩৪৯ হিজরী।
(৭) ফেরকায়ে গাজনুভিয়্যাহ। প্রতিষ্ঠা কালঃ ১৩৫৩
হিজরী।
(৮) জমিয়াতে আহলে হাদীস প্রতিষ্ঠা কালঃ ১৩৭০ হিজরী।
(আল ইনতেখাবে মহিউদ্দিন ১৩৭৮হিজরী খুৎবায়ে ইমারাত পৃঃ২৬)
উল্লেখিত জরিপ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সে যুগে মাত্র ৬৫বৎসরে ৯টি ফেরকার জন্ম নিয়েছিল। যাদের উদ্দেশ্যই ছিল উম্মতের মাঝে অনৈক্যের জাল
বিস্তার করা। ইতিহাস বলে যে তারা এ কুকর্মে সফলকামও হয়েছিল।এর দ্বারা অনুমান করা যায়
১৩৭৮ হিজরী সন হতে আজ পর্যন্ত তাদের কতগুলো ফেরকার আবিস্কার হয়েছে ।
প্রফেসর মুহাম্মহ মুবারক ও মৌলভী আতাউল্লাহ
ভূজিয়ালভী এই গায়রে মুকাল্লীদদ্বয় থেকে এর
স্বপক্ষে স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় সায়্যিদ আহমদ শহিদ (রহ: )এর মত বুজুর্গের
গঠিত আন্দোলনকে বালাকোটের যুদ্ধে ভেঙ্গে দেওয়াও ছিল বৃটিশদের দালালির সার্থে এ ফের্কার মুল মীশন। (তাহরীকে মুজাহিদীন -পৃঃ৪৮)
This comment has been removed by the author.
ReplyDeleteতথাকথিত আহলে হাদীসদের গোড়ার কথা
ReplyDeleteপ্রায় দু’শত বছর ইংরেজদের গোলামীতে আবদ্ধ ছিল ভারত উপমহাদেশের সমস্ত মুসলমান। এ দেশের মুসলিম কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিলুপ্ত করে তাদের শাসন-শোষণ স্থায়ী করার হীন প্রচেষ্টায় ইংরেজ বেনিয়ারা বহুমুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কেবল ১৮৫৭ ইংরেজীর আযাদী আন্দোলনে তারা ৫৫ হাজার মুসলমানকে শহীদ করে। ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত ৩ বছরে হিংস্র হানাদাররা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শহীদ করে ১৪ হাজার আলেমকে। আগুনে পুড়িয়ে ও গুলি করে শহীদ করে অসংখ্য আলেম-উলামা ও নিরীহ মুসলমানদেরকে। ইজ্জতহরণ ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয় অসংখ্য মুসলিম মা-বোন। কারাবরণ করেন হাজার-হাজার মুসলমান। কেবল দিল্লী শহরেই তারা জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে প্রায় দশ হাজার মাদ্রাসা।
অথচ সেই ইংরেজদের দালালী করেই আজ একটি দল তাদের মনগড়া ইসলাম (!) প্রচারে ব্যস্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এমন অনেক ভ্রান্ত দলের যারা অনুসরণ করেন, তারা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। তাই নিম্নে তাদের জন্য কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হল, এ থেকে যদি একজন মানুষও উপকৃত হয় তাহলে আমার এই পোস্ট স্বার্থক হবে বলে আমি মনে করি।
ইতিহাসের পাতায়ঃ
১।
“ মুযাহেরে হক্ব ” কিতাবের স্বনামধন্য লেখক মাওলানা “ কুতুব উদ্দীন ” তাঁর “ তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযম ” গ্রন্থে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যার সার-সংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ
“ সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, মাওলানা ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আব্দুল হাই (রহঃ) পাঞ্জাবে আগমন করার পরপরই কতিপয় বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীর সমন্বয়ে চার মায্হাবের ইমামগণের তাক্বলীদ অস্বীকারকারী নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত লক্ষ্য করা যায়, যারা হযরত সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর মুজাহিদ বাহিনীর বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য ছিল, এদের মূখপাত্র ছিল মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী (মৃত-১২৭৫হিঃ)। তার এ ধরণের অসংখ্য ভ্রান্ত কর্মকান্ডের কারণে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) ১২৪৬ হিজরীতে তাকে মুজাহিদ বাহিনী থেকে বহিষ্কার করেন। তখনই গোটা ভারতবর্ষের সকল ধর্মপ্রাণ জনগণ, বিশেষ করে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর খলিফা ও মুরীদগণ হারামাইন শরীফাইনের তদানীন্তন উলামায়ে কিরাম ও মুফতীগণের নিকট এ ব্যাপারে ফত্ওয়া তলব করেন। ফলে সেখানকার তৎকালীন চার মায্হাবের সম্মানীত মুফতীগণ ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে মৌঃ আব্দুল হক্ব ও তার অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ফিরক্বা বলে অভিহিত করেন এবং মৌঃ আব্দুল হক্বকে ক্বতল (হত্যা) করার নির্দেশ প্রদান করেন।
(এ ফতওয়া ১২৫৪ হিজরীতে তান্বীহুদ্দাল্লীন নামে প্রকাশ করা হয়, এখনো দেশের বিশিষ্ট লাইব্রেরীতে এর কপি সংরক্ষিত রয়েছে।)
মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারস পলায়ন করতঃ কোনভাবে আত্নরক্ষা পায়। সেখানে গিয়ে তার নবাবিষ্কৃত দলের প্রধান হয়ে সরলমনা জনসাধারণের মধ্যে তার বিষাক্ত মতবাদ ছড়াতে থাকে।”
(তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযমঃ পৃঃ ১৬ খঃ ২, আল-নাজাতুল কামেলাঃ পৃঃ ২১৪, তান্বীহুদ্দাল্লীন, পৃঃ ৩১)
উপরোক্ত বিবরণ থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী কর্তৃক ১২৪৬ হিজরীতে ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ তথা লা-মায্হাবী নামক নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সে “ ওহ্হাবী ” হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সে নিজেকে “ মুহাম্মদী ” বলে প্রচার করতো। পরবর্তীতে “ ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম ” এ মর্মে ফত্ওয়া দিয়ে ইংরেজের দালাল হিসেবে চিহ্নিত হয়। এবং এ সুযোগে সে সরকারী কাগজ-পত্র থেকে “ ওহ্হাবী ” নাম রহিত করে আহ্লে হাদীস নাম বরাদ্দ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নবোদ্ভাসিত এ ফিরক্বাটিই আজ নিজেদের ব্যতীত অন্যান্য সবাইকে নবোদ্ভাসিত বা বিদ্য়া’তী বলে অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক নয় কি !
২।
এ মর্মে তাদের দলেরই অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও পরিচালক নবাব ছিদ্দীক্ব হাসান খানের কয়েকটি উক্তি আমাদের বক্তব্যের পক্ষে সাক্ষ্য বহন করে, যেমন তার রচিত গ্রন্থ “ তরজমানে ওহ্হাবিয়্যায় ” তিনি লিখেনঃ
“ আমাদের নতুন মায্হাবে আযাদী (অর্থাৎ তাক্বলীদ না করা) বৃটিশ সরকারী আইনেরই চাহিদা মোতাবেক। ”
(তরজমানে ওহ্হাবিয়্যায়ঃ পৃঃ ২/৩)
৩।
আহলে হাদীস দলের একাংশের নাম “ গুরাবা আহ্লে হাদীস ”। এ অংশের নেতা মুহাম্মাদ মুবারকের উক্তি হলঃ
“ গুরাবা আহলে হাদীসের ভিত্তি হযরত মুহাদ্দিসীনদের সঙ্গে মতানৈক্য করার জন্যেই রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয় বরং সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) এর বিরুদ্ধাচরণ করে ইংরেজদেরকে খুশী করাই ছিল এর বিশেষ উদ্দেশ্য। ”
(উলামায়ে আহ্নাফ আওর তাহরীকে মুজাহিদীনঃ পৃঃ ৪৮)
৪।
ReplyDeleteভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের প্রধান মূখপাত্র মিঞা নযীর হুসাইনের অন্যতম শিষ্য অকীলে আহলে হাদীস্ মোলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লিখেনঃ
“ ঐ আহলে হাদীস দল বৃটিশ সরকারের কল্যাণপ্রত্যাশী, চুক্তি রক্ষাকারী ও অনুগত হওয়ার অত্যন্ত উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ প্রমাণ হলঃ তারা বৃটিশ সরকারের অধীনে থাকা, কোন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনের থাকার চেয়েও উত্তম মনে করে।”
(আল-হায়াত বা’দা্ল মামাতঃ পৃঃ ৯৩)
৫।
তথাকথিত সেই মোলভী মুহাম্মাদ হুসাইন ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করার বিপক্ষে “ আল-ইক্বতিছাদ-ফী মাসাইলিল জিহাদ ” নামক গ্রন্থ রচনা করে, যাতে সে জিহাদ “ মান্ছুখ ” বা রহিত বলে ঘোষণা করে। এর ফলশ্রুতিতে সে ইংরেজের বিশ্বস্ত ও ভাড়াটে গোলামে গণ্য হয়। আর লাভ করে টাকা-পয়সার বিরাট অংক।
(হিন্দুস্থান কী পহলী ইসলামী তাহরীকঃ পৃঃ ২১২, আহলে হাদীস আওর ইংরেজঃ পৃঃ ৮৭)
৬।
তাইতো তারই বিশিষ্ট শিষ্য মৌলভী আলতাফ হুসাইন লিখেনঃ
“ হিন্দুস্তানে ইংরেজী গভার্মেন্ট আমরা মুসলমানদের জন্য খোদার রহমত। ”
(আল-হায়াত বা’দাল মামাতঃ পৃঃ ৯৩)
সম্মানিত পাঠক সমাজ! ইংরেজ আমলে ইসলাম ও মুসলমান্দের দুরবস্থার করুণ কাহিনী বলার অপেক্ষা রাখে না, যেদিন সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার এদেশের হাজার হাজার আলিম-উলামা ও মহামনীষীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিল, আর দ্বীপান্তরের কঠিন বন্দিশালায় নিক্ষেপ করেছিল লক্ষ লক্ষ তৌহিদী জনতাকে। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল ইয্যতহারা মা-বোনদের গগন-বিদারী আর্তনাদে। জ্বালিয়ে দিয়েছিল হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা আর ভস্মীভূত করেছিল লক্ষ কোটি কুরআন-কিতাব, তখনই হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দীসে দেহলভী (রহঃ) কর্তৃক দৃপ্তকন্ঠে ঘোষিত হল জিহাদের ফত্ওয়া, এ ফাত্ওয়ার বলে উলামায়ে কিরাম ও সমগ্র তৌহিদী জনতা ঝাপিয়ে পড়েন আযাদী আন্দোলনের জিহাদে। শহীদ হন হাজার হাজার বীর মুজাহিদ। আর ঠিক এমনি এক করুণ মুহূর্তে “ আহলে হাদীস ” নামধারী দলটি সেই ইংরেজ সরকারকে “ খোদার রহমত ” বলে আখ্যায়িত করে, আর তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ হারাম বলে ফাত্ওয়া দিয়ে হালুয়া-রুটির সুব্যবস্থা করে। তারা কি মুসলমান ? তারা কী চায়? কী তাদের উদ্দেশ্য? কোথায় তাদের গন্তব্য?
উপরোক্ত তথ্যাবলী থেকে একথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার ভারতবর্ষে মুসলমানদেরকে দ্বিধা বিভক্ত করতঃ তাদের আধিপত্য মজবুত ও বিস্তার করার মানসে যে সমস্ত হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল, এরই ফলশ্রুতিতে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল কাদিয়ানী, বেরলভী ও তথাকথিত “ আহলে হাদীস ” তথা “ লা-মায্হাবী ” দল সে দিনের ঐ বৃটিশ জালিম তল্পীবাহকদেরই উত্তরাধিকারী ও দোসর।
৭।
ReplyDeleteইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, ১২৪৬ হিজরীর পর এই উপমহাদেশে সৃষ্ট বিদ্য়া’ত ও নতুন ফিরক্বাটিকে মুসলমানগণ যখন ওহ্হাবী বলে আখ্যায়িত করতে থাকেন তখন তারা নিজেদেরকে মুহাম্মাদী বলে দাবী করে। সে হিসেবে মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী ও মৌঃ নজীর হুসাইন ভারতবর্ষের প্রথম মুহাম্মাদী নামের দাবীদার। অনুরূপ ভাবে তাদের তদানীন্তন অনুসারীরাও মুহাম্মাদী নামেই আত্নপ্রকাশ করতো। এ ধারায় নবাব ছিদ্দিক্ব হাসান খান ১২৮৫ হিজরীতে মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী থেকে লিখিত ভাবে মুহাম্মাদী উপাধি লাভ করেন।
( মায্হাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহঃ পৃ – ৩৬ )
৮।
বর্তমানে অবশ্য গাইরে মুক্বাল্লিদরা ওহ্হাবী বা সালাফী নামে আত্নপ্রকাশ করে সউদী রিয়াল, দিনার, দিরহাম উপার্জনের মোহে ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু ১২৪৬ হিজরীতে, তাদের উদ্ভবের সূচনালগ্নে যখন তেল পেট্রোলের পয়সার জমজমাট ছিল না, ওহ্হাবীদেরই যখন দুর্দিন দুর্ভিক্ষ চলছিল, বিশেষ করে ভারতবর্ষে ইংরেজ-বিরোধী ও ইংরেজ বিতাড়নের জিহাদে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদেরকে ইংরেজ সরকার ওহ্হাবী বলে আখ্যায়িত করেছিল, তখন গাইরে মুক্বাল্লিদরা ওহ্হাবী নামের আখ্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই তারা তখন নিজেদের জন্য “ মুহাম্মদী ” এবং পরবর্তীতে “ আহলে হাদীস ” নাম বরাদ্দ করার সম্ভাব্য সকল অপতৎপরতা চালিয়ে গিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের তৎকালীন অন্যতম মুখমাত্র মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লাহোরী বৃটিশ সরকারের প্রধান কার্যালয় এবং পাঞ্জাব, সি-পি, ইউ-পি, বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বাঙ্গালসহ বিভিন্ন শাখা অফিসে ইংরেজ প্রশাসনের আনুগত্যতা ও বশ্যতা স্বীকার করত: তাদের জন্য “ আহ্লে হাদীস ” নাম বরাদ্দ দেয়ার দরখাস্ত পেশ করেন। এ দরখাস্তগুলোর প্রতি উত্তর সহ তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত তৎকালীন “ এশায়াতুস সুন্নাহ ” পত্রিকায়ও প্রকাশ করা হয় যা পরে সাময়ীক নিবন্ধ আকারেও বাজারজাত করা হয়।
( এশায়াতুস সুন্নাহঃ পৃ: ২৪-২৬, সংখ্যা: ২, খ: ১১)
তাদের মানসিকতা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করার জন্য পাঠক সমীপে তন্মধ্য হতে একটি দরখাস্তের অনুবাদ নিম্নে পেশ করছিঃ
“বখেদমতে জনাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী,
আমি আপনার খেদমতে লাইন কয়েক লেখার অনুমতি এবং এর জন্য ক্ষমাও পার্থনা করছি। আমার সম্পাদিত মাসিক “ এশায়াতুস সুন্নাহ ” পত্রিকায় ১৮৮৬ ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলাম যে, ওহ্হাবী শব্দটি ইংরেজ সরকারের নিমক হারাম ও রাষ্ট্রদ্রোহীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং এ শব্দটি হিন্দুস্তানের মুসলমানদের ঐ অংশের জন্য ব্যবহার সমীচিন হবে না, যাদেরকে “ আহ্লে হাদীস ” বলা হয় এবং যারা সর্বদা ইংরেজ সরকারের নিমক হালালী, আনুগত্যতা ও কল্যাণই প্রত্যাশা করে, যা বার বার প্রমাণও হয়েছে এবং সরকারী চিঠি প্রত্রে এর স্বীকৃতিও রয়েছে।
অতএব, এ দলের প্রতি ওহ্হাবী শব্দ ব্যবহারের জোর প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে এবং সাথে সাথে গভার্মেন্টের বরাবর অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে আবেদন করা যাচ্ছে যে, সরকারীভাবে এ ওহ্হাবী শব্দ রহিত করে আমাদের উপর এর ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক এবং এ শব্দের পরিবর্তে “ আহ্লে হাদীস ” সম্বোধন করা হোক।
আপনার একান্ত অনুগত খাদেম
আবু সাঈদ মুহাম্মদ হুসাইন
সম্পাদক, এশায়াতুস সুন্নাহ
দরখাস্ত মুতাবেক ইংরেজ সরকার তাদের জন্যে “ ওহ্হাবী ” শব্দের পরিবর্তে “ আহ্লে হাদীস ” নাম বরাদ্দ করেছে। এবং সরকারী কাগজ-চিঠিপত্র ও সকল পর্যায়ে তদের “ আহ্লে হাদীস ” সম্বোধনের নোটিশ জারি করে নিয়মতান্তিকভাবে দরখাস্তকারীকেও লিখিতভাবে মঞ্জুরী নোটিশে অবহিত করা হয়।
ReplyDeleteসর্বপ্রথম পাঞ্জাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী মি: ডাব্লিউ, এম, এন (W.M.N) বাহাদুর চিঠি নং-১৭৫৮ এর মাধ্যমে ৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৬ ইংরেজিতে অনুমোদনপত্র প্রেরণ করেন। অতপর ১৪ই জুলাই ১৮৮৮ইং সি,পি গভার্মেন্ট চিঠি নং-৪০৭ এর মাধ্যমে এবং ২০শে জুলাই ১৮৮৮ইং ইউ,পি গভার্মেন্ট চিঠি নং-৩৮৬ এর মাধমে এবং ১৪ই আগষ্ট ১৮৮৮ইং বোম্বাই গভার্মেন্ট চিঠি নং-৭৩২ এর মাধ্যমে এবং ১৫ই আগষ্ট ১৮৮৮ মাদ্রাজ গভার্মেন্ট চিঠি নং-১২৭ এর মাধ্যমে এবং ৪ঠা মার্চ ১৮৯০ইং বাঙ্গাল গভার্মেন্ট চিঠি নং-১৫৫ এর মাধ্যমে দরখাস্তকারী মৌলভী আবু সাইদ মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভীকে অবহিত করা হয়।
( এশায়াতুস সুন্নাহঃ পৃ: ৩২-৩৯, সংখ্যা: ২, খ: ১১)
কোন মুসলিম জামাতের নাম অমুসলিম, মুসলামানদের চিরশত্রু খৃষ্টান নাছারাদের মাধ্যমে বরাদ্দ করার ঘটনা ইসলামী ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বিরল। যা কেবল হিন্দুস্তানী গাইরে মুক্বাল্লিদদেরই গৌরব ও সৌভাগ্যের বিষয় (!) তাই তারা এ ইতিহাসটা অত্যন্ত গৌরবের সহিত নিজেরদের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করে তৃপ্তি লাভ করেছেন।
http://sonarbangladesh.com/blog/Truth_Islam/98863
মাযহাব হল কোরআন সুন্নাহ অনুযায়ী চলার জন্য সঠিক পদ্ধতি কারন ফিকহের কিতাবে কোরআন ও সুন্নাহর সঠিক ব্যখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। কোরআন ও সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে সকল ইমাম সেটা গ্রহন করেছেন এতে কারো কোন দ্বীমত নেই। কিন্তু যে সকল বিষয়ে কোরআন সুন্নাহর ষ্পষ্ট বিধান উল্লেখ নেই আর থাকলেও বাহ্যিকভাবে সাধারনের কাঝে পরষ্পর বিরোধী মনে হতে পারে কিন্তু আদৌ পরষ্পর বিরুধী নয় আর এই সকল সুক্ষ বিষয় মুজতাহিদ ইমামগন ইজতিহাদ করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। একাধিক হাদীস আছে যা পরষ্পর বিরোধী মনে হবে যার প্রত্যেকটির দলীল সহীহ এক্ষেত্রে ইমামগন কোন একটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন আর এটা হল সুন্নতের বিভন্নতা। মাযহাব যদি এতই সমস্য হবে তাহলে হাদীসের ইমামগন কেন একটিও অধ্যায় রচনা করলেননা মাযহাবের বিরোধীতা করে????মাযহাব যদি সমস্যা হয় তাহলে কেন তারা মাযহাব মানতেন???মাযহাব যদি সমস্যা হয় তাহলে পরবর্তী যুগশ্রেষ্ঠ সকল মুহাদ্দীসীনে কেরাম কেন মাযহাব মানতে বলেছেন???আফসোস লা-মাযহাবীদের জন্য যারা মানুষকে গোমরাহ করার দাওয়াত দেয়।
ReplyDelete***মাযহাব মানা যদি সমস্যা হয় তাহলে উম্মতের রাহবাররা তো এর প্রতিবাদ করার কথা।
ReplyDeleteদেখি তারা এর পক্ষে ও বিপক্ষে কি বলেছে
***ইমাম নববী (রহঃ) (মৃঃ ৬৭৬ হিঃ) ‘রাওযাতুত তালেবীন’ নামক গ্রন্থে লিখেনঃ “উলামাগণ বলেন, ইজতিহাদে মুতলাক ইমাম চতুষ্টয় পর্যন্ত খতম হয়ে গেছে। তাই তাঁরা ইমাম চতুষ্টয়ের কোন একজনের ‘তাক্বলীদ’ মুসলিম উম্মাহর জন্য ওয়াজিব সাব্যস্ত করে দিয়েছেন।
***ইমামুল হারামাইন জুয়াইনী (মক্কা-মদীনা শরীফের ইমাম সাহেব – রহঃ, মৃঃ ৪৭৮ হিঃ) মায্হাব চতুষ্টয়ের তাক্বলীদ ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ‘ইজমা’ উল্লেখ করেছেন। ” ( নুরুল হিদায়া হতে সংকলিত, পৃ – ১০; দেখুনঃ ফয়যুল কাদীরঃ পৃ – ১/২১০; শরহুল মুহায্যাব, নববীঃ পৃ – ১/৯১, আদাবুল মুস্তাফতী অধ্যায় )
***শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) (মৃঃ ৭২৮ হিঃ) লিখেছেনঃ “ মুসলিম উম্মাহর ‘ইজমা’ উপেক্ষা করে মায্হাব চতুষ্টয়ের বিপরীতে কোন মায্হাব রচনা বা গ্রহণ বৈধ হবে না। ” ( ফাত্ওয়া-ইবনে তাইমিয়াহ পৃ –২/ ৪৪৬ )
***আল্লামা ইমাম ইবনে হাজার মক্কী (রহঃ) (মৃঃ ৯৭৩ হিঃ) তাঁর স্বীয় প্রসিদ্ধ কিতাব ‘ফাতহুল মুবীন’ এ লিখেনঃ “ আমাদের যুগের বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আবু হানীফা, শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ বিন হাম্বল (রহ) – এচার ইমাম ব্যতীত অন্য কারও তাক্বলীদ (অনুসরণ) জায়িয নয়। ”( ফাতহুল মুবীনঃ পৃ – ১৯৬ )
***মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহ্হাব নজদী (রহঃ) এর মায্হাবঃ লা-মায্হাবীরা দাবী করে থাকে যে,মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাব নজদীও লা-মায্হাবী ছিলেন। কিন্তু তিনি একজন হাম্বলী মায্হাবের অনুসারী ছিলেন এবং তিনি নিজেই স্বীয় মায্হাব সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। -দেখুনঃ আল-হাদিয়াতুস্ সুন্নাহঃ পৃ – ৯৯ । সাথে সাথে চার মায্হাবের যে কোন একটির তাক্বলীদ করা যাবে এবং এই চার মায্হাব ছাড়া অন্য কোন মায্হাবের অনুসরণ করা যাবে না বলেও তিনি মত প্রকাশ করেছেন। -তারীখু নাজদ-আলূসীঃ পৃ – ৫৪-৫৬;ছিয়ানাতুল্ ইনসানঃ পৃ – ৪৭১১
***শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রহঃ)(মৃঃ ১১৭৬ হিঃ), লা-মায্হাবীদের কাছেও যিনি গ্রহণযোগ্য, তাঁর সুপ্রসিদ্ধ কিতাব হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগায় লিখেনঃ “ সু-বিন্যস্ত গ্রন্থবদ্ধ এ চার মায্হাবের উপর সকল ইমামগণের ‘ইজমা’ তথা ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ” (হুজ্জাতুল্লাহি ল বালেগাঃ পৃ – ১/ ১২৩ )
***হযরত আল্লামা ইবনে হাজার মক্কী (রহ.) আল'আরবাঈন নামক কিতাবের ব্যাখ্যা গ্রন্থ "ফতহুল'মুবীন" এর মধ্যে বলেন,
وأمافى زماننا فقال أئمتنا: لايجوزتقليد غيرالأئمة الأربعة; الشافعى ومالك وأبى حنيفة وأحمد بن حنبل : رحمهم الله تعالى *
অর্থঃ আমাদের ইমামগণ বলেছেন, চার ইমাম (১) ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (২) ইমাম মালেক (রহ.) (৩) ইমাম আবু হানীফা (রহ.) (৪) ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ছাড়া অন্য কোন ইমামের অনুসরণ করা জায়েয নেই
***হযরত মোল্লা'জিওন সাহেব (রহ.) তাফসীরে আহমাদিয়ায় লিখেছেন যে,
والإنصاف أن إنحصارالمذاهب فى الأربع فضل إلهى وقبولية من عندالله تعالى لامجال فيها للتوجيهات والأدلة ؛
অর্থঃ ইনসাফ হল, মাযহাব চারের মধ্যে সামীবদ্ধ হওয়া আল্লাহ পাকের দয়া ও তা কবুল হওয়ার দলীল এক্ষেত্রে দলীল ও ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ নেই।
***বিখ্যাত উসূলে হাদীস বিশারদ, ইবনি নুজাইম (রহঃ) (মৃঃ ৯৭০ হিঃ) লিখেনঃ
ReplyDelete“ যে ব্যক্তি ইমাম চতুষ্টয়ের বিপরীত মতামত পোষণ করবে সে মুসলিম উম্মাহর ‘ইজমা’ তথা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হবে। ”
( আল্-আশ্বাহ্ ওয়ান নাযাইরঃ পৃ – ১৩১ )
***আল্লামা শা’রানী (রহঃ) (মৃঃ ৯৭৩ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত কিতাব আল্-মিযানে লিখেনঃ
“ নিজে পথভ্রষ্ট না হওয়া ও অপরকে পথভ্রষ্ট না করার জন্য নির্দিষ্ট মায্হাবের অনুসরণ জরুরী। ”
( ইনতেছারুল হক্ব হতে সংকলিতঃ পৃ – ১৫৩ )
***ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের উস্তাদ, হাদীসের জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বজন স্বীকৃত ইমাম বিশেষত হাদীস যাচাই-বাছাই বা ইল্মুল্ জারহ্ অ-তা’দীলের অতুলনীয় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্যাসাগর ইয়াহ্ইয়া ইবনে মঈন (রহঃ) অসীম জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি বল্গাহীন পথ পরিহার করে ইমাম আবু হানীফার তাক্বলীদ করে চলতেন। “ আমার নিকট গ্রহণযোগ্য ক্বিরাআত হামযার ক্বিরাআত এবং গ্রহণযোগ্য ফিক্বহ ইমাম আবু হানিফার ফিক্বহ। সকল মানুষকেও আমি এর উপর ঐক্যবদ্ধ পেয়েছি। ” ( তারিখে বাগদাদঃ পৃ – ১৩/৩৪৭ )
কিন্তু ৪ মাযহাবের বিপক্ষে উম্মতের কোন পূর্ববর্তী গ্রহনযোগ্য আলেমের অবস্থান আমি অধমের চোখে পড়েনি
*******ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী মাঝহাবে অনুসারী ছিলেন।
(শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী রহ., “আল-ইনসাফ”, পৃষ্ঠা : ৬৭
আল্লামা তাজউদ্দীন সুবকী, “তবক্বাতুশ শাফেয়ীয়ার”, পৃষ্ঠা : ২/২
গাইরে মুকাল্লিদ আলেম নবাব ছিদ্দিক্ব হাসান খান, “আবজাদুল উলুম”, পৃষ্ঠা : ৮১০)
***ইমাম মুসলিম শাফেয়ী মাঝহাবে অনুসারী ছিলেন।
(গাইরে মুকাল্লিদ আলেম নবাব ছিদ্দিক্ব হাসান খান, “আল হিত্তার”, পৃষ্ঠা : ১৮৬)
***ইমাম তিরমিযী সম্বন্ধে শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দেহে দেহলভী “আল-ইনসাফের” ৭৯ পৃষ্ঠায় মুজতাহিদ তবে হাম্বলী মাযহাবের প্রতি আকৃষ্ট এবং এক পর্যায়ে হানাফী বলেও উল্লেখ করেছেন।
***ইমাম নাসাঈ
এবং ইমাম আবু দাউদ রহ. হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
(আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. “ফয়জুল বারী”-এর ১/৫৮ পৃষ্ঠায় ইবনে তাইমিয়্যার উদ্বৃত্তি দিয়ে উল্লেখ করেছেন।
গাইরে মুকাল্লিদ আলেম নবাব ছিদ্দিক্ব হাসান খান, “আবজাদুল উলুম”, পৃষ্ঠা : ৮১০)
***ইমাম ইবনে মাজাহকে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী “ফয়জুল বারী”-এর ১/৫৮ পৃষ্ঠায় শাফেয়ী বলে উল্লেখ করেছেন।
তাকলীদ করতে হয় কেন?
ReplyDeleteহাদীস “রসুলুল্লাহ(সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনীস ছাড়লাম। তোমরা যতদিন সেদুটিকে দৃঢ় হস্তে ধারন করে থাকবে,ততদিন কখনই পথভ্রষ্ট হবে না্। আল্লাহর কিতাব ও তার রসুলের সুন্নত।(মুঅত্তা মালিক ৩৬৩ পৃষ্ঠা মিশকাত ৩১ পৃষ্ঠা)।
তবে কোরআন হাদীসের কিছু আহকাম তো খুবই ষ্পষ্ট। প্রত্যেকে সেগুলি বুঝতে পারে।পক্ষান্তরে কোরআন হাদীসের বেশকিছু আহকাম,একাধিক অর্থ বোধক বা বাহ্যিকভাবে পরষ্পর বিরোধী। নিন্মে তার একটি উদাহরন পরিধান করুনঃ সহীহ বুখারী ১/১০৪ পৃষ্ঠা ও সহীহ মুসলিম১/১৬৯ পৃষ্ঠায় আছে নবী(সঃ) বলেছেনঃ সুরা ফাতিহা না পড়লে কোন ব্যাক্তির নামায হয়না। আবার সহীহ সুত্রে এও বর্নিত আছে নবী(সঃ)নবী(সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন ইমামের পেছেনে ইক্তিদা করবে ,সেই ইমামের কুরআন পড়া মানে তার পড়া। ইবনে মাজাহ ৬১ পৃষ্ঠা,মুঅত্তা মুহাম্মদ ৯৮ ও ৯৯ পৃষ্ঠা,ইবনে আবী শায়বা১/৩৭৬ পৃষ্ঠা,মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক ২/১৩৬ পৃষ্ঠা ২৭৯৭ নং হাদীস, ত্বহাবী ১/১০৬ পৃষ্ঠা,বায়হাকী ২/১৬০ পৃষ্ঠা, ও দারাকুতনী ১/৩২৩-৩২৫ পৃষ্ঠা, আলবানী সাহেব স্বীয় সিফাতু স্বলাতিন নবী কিতাবে ৩৫৬ পৃষ্ঠায় এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। প্রথম হাদীস থেকে বোঝা যায় সুরা ফাতিহা পড়া জরুরী। আর দ্বীতিয় হাদীসের দাবী মুক্তাদীর জন্য সুরা ফাতিহা বা কোরআনের অন্য কিছু পড়ার দরকার নেই।কেননা তার জন্য ইমামের কোরআন পড়াটাই যথেষ্ট। উভয় হাদীসই সহীহ,। আবার বাহ্যিকভাবে পরষ্পর বিরোধী। বলাবাহুল্য কোরআন ও হাদীসের যে সমস্ত বানী একাধিক অর্থবোধক সেক্ষেত্রে হয় নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ও গবেষনার উপর ভরসা করে কোন ফায়সালা করতে হবে,অন্যথায় পুর্ববর্তী ইমাম-মুজতাহিদগন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার উপর ভরসা করে আমল করতে হবে।প্রথমটি ভয়াবহ ও দুর্গম পন্থা। আর দ্বীতিয়টি খুবই নিরাপদ ও সহজসাধ্য। তাই কুরআন ও হাদীসের এরুপ দুর্বোধ্য মাসাইল যথার্থ মুজতাহিদের উপর ভরসা করে তার রায় ও সিদ্ধান্তকে মনে প্রানে গ্রহন করা হয়। এরই নাম তাক্বলীধ। এটাই হল তাক্বলীদের স্বরুপ।
কোরআন থেকে তাকলীদের প্রমান
ReplyDelete1..আল্লাহ পাক ৫ম পারা সুরা নিসা ৫৯ নং আয়াতে মুমিন বান্দাদেরকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ তরজমাঃ হে মুমিনেরা!তোমরা আল্লাহর অনুগত হও,রসুলের অনুগত হও, আর তোমাদের মধ্য থেকে ‘উলুল আমর’ ব্যক্তিদেরও (অনুগত)হও।
উলুল আমর কারা—মুস্তাদারাক হাকিম১/১২৩ পৃষ্ঠায় সহীহ সুত্রে বর্ণিত আছে,হযরত জাবির(রযিঃ)বলেনঃ উলুল আমর মানে ফক্বীহগন। তাফসীরে ইবনে জারীর৫/৮৮ পৃষ্ঠা ও মুস্তাদারাক ১/১২৩ পৃষ্ঠায় মুফাসসির সম্রাট হযরত ইবনে আব্বাস (রযিঃ) থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্নিত আছে উলুল আমর মানে ফক্বীহ ও দ্বীনদার ব্যাক্তগন।
এছাড়া সাহাবা ও পরবর্তী প্রায় সকল তাবিয়ীন মুফাসসিরগন থেকে বর্ণিত আছে যে,উলুল আমর মানে ফক্বীহ ব্যক্তিগন। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে উলুল আমর মানে শাসক ব্যক্তিগন ।ইমাম রাযী তাফসীরে কবীর/৩/৩৩৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে,-অত্র আয়াত পাকে ‘উলুল আমর’ মানে উলামা। এটাই শ্রেয়। ইমাম জাসসাস(রঃ)’আহকামুল কোরআন’২/২৫৬ পৃষ্ঠায় বলেনঃ এখানে উভয় অর্থই উদ্দেশ্য। পার্থিব বিষয়ে মুসলিম শাশকদের ও শরয়ী মাসাইলে উলামা-ফুকাহদের অনুগত হতে হবে। আল্লামা ইবনে কায়্যিম স্বীয় আ’লামুন মুওয়াক্কিয়ীন কিতাবে ১/৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-তাত্বিক রায় এটাই যে,শাসকদের অনুগত্য স্বীকার তখনই করা হবে যখন তারা ইলম অনুযায়ী আদেশ করবেন। তাই শাসকদের আনুগত্য প্রকৃত পক্ষে উলামাদের আনুগত্যের অধীন।
উক্ত আয়াতের শেষাংশ আল্লাহ পাক বলেনঃ যদি কোন বিষয়ে তোমাদের পরস্পরে মত পার্থক্য ঘটে,তাহলে সেটা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের সমর্পন কর,যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। বিখ্যাত আহলে হাদীস আলিম নবাব সিদ্দিীক হাসান খান সাহেব এই শেষাংশের ব্যাখ্যায় বলেনঃ অনুবাদ-এটা সুষ্পষ্ট যে,এখানে মুজতাহিদগনকে নতুন করে স্বতন্ত্রভাবে সম্বোধন করা হয়েছে।(তাফসীরে ফতহুল বয়ান২/৩০৮পৃষ্ঠা) তাহলে অত্র আয়াত পাকের প্রথমাংশে মুকাল্লিদগনকে তকলীদ করার আদশ দেওয়া হয়েছে এবং শেষাংশে মুজতাহিদগনকে কুরআন হাদীসে ইজতিহাদ (গবেষনা) করতে বলা হয়েছে। এটাই হল উক্ত আয়াতের সারমর্ম।
তকলীদের প্রথম প্রকার
ReplyDeleteউদাহরন স্বরুপ-হযরত উমার(রযিঃ) যখন আহত ছিলেন,তখন একদা বললেন দাদার ওয়ারিস হওয়ার মাসয়ালায় আমার মনে একটি রায় জেগেছে। যদি তোমরা সেটি মানতে। একথা শুনে হযরত উসমান বললেনঃ আমরা যদি আপনার রায়ের অনুস্বরন করি,তাহলে এটা সঠিক পথের দিশারী হবে। আর যদি আপনার পুর্বের জ্ঞানবৃদ্ধ(হযরত আবু বকর(রযিঃ) এর রায়ের অনুসরন করি তাহলে,তিনিও সঠিক রায়ের অধিকারী ছিলেন।( মুস্তাদারাক হাকম ৪/৩৭৮ পৃষ্ঠা,৭৯৮৩ নং হাদীস) ইমাম হাকিম ও ইমাম যহাবী হাদীস বেত্তাদ্বয় উক্ত হাদীসের সুত্রটিকে বুখারী মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। অত্র হাদীসে নিদ্দিষ্টভাবে কোন একজনের রায়কে অনুসরনের জন্য নিদ্দিষ্ট করা হয়নি। এটাই হল তকলীদে মুতলাক। তথাকথিত আহলে হাদীসেরা এই প্রথশ প্রকার তকলীদকে অস্বীকার করতে পারেনা। কারন এই তকলীদে মুতলাক পরিত্যাগের ফলে মানুষ হয় ঈমান হারা
বিখ্যাত আহলে হাদীস আলিম মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী একথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি স্বীয় তিক্ত অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেছেন-২৫ বছরের অভিজ্ঞতা দ্বারা বুঝেছি যে, যারা ইলম না থাকা সত্ত্বেও মুজতাহিদে মুতলাক ও মুতলাক তকলীদ পরিত্যাগী হয়ে যায়, তারা শেষ পর্যন্ত ইসলাম ধর্মকে শেষ সালাম করে বসে। তন্মধ্যে কেউ তো খ্রিষ্টান হয়ে যায়,আর কেউ বা বেদ্বীন ।দ্বীন ধর্মের পাবন্দী থাকেনা।শরীয়তের হুকুম-আহকাম লঙ্ঘন ও বিমুখতা তো এই স্বাধীনতার ন্যুনতাম পরিনাম।(মুকাম্মাল মুদাল্লাল ফাতাওয়া মাহমুদিয়া২/৬০৮ পৃষ্ঠা থেকে সংগৃহিত।
তকলীদের দ্বিতীয় প্রকার
ReplyDeleteতাকলীদের দ্বীতিয় প্রকার হল তাকলীদে শখসী। এর মানে, সর্ব ক্ষেত্রে নিদ্দিষ্ট একজন ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরন করা। অথ্যাৎ ইমাম আবু হানীফা,ইমাম শাফেয়ী,ইমাম মালিম,ইমাম আহমদ(রহঃ) এই চারজন বিশ্ববরেন্য ইমামগনের মধ্যে থেকে নিদ্দিষ্টভাবে কোন একজনের মাযহাবের পাবন্দী হওয়ার নাম তাকলীদে শখসী বা ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ। এসম্পর্কে ভারতরত্ন শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী(রঃ) মৃত্যু ১১৭৬ হিজরী) বলেছেনঃ
অনুবাদঃ জানা দরকার যে,নিশ্চয় এই মাযহাব চারটি ধারন করায় বড় উপকার নিহিত আছে এবং এর সবগুলি থেকে পরান্মুখ হওয়ায় বিশাল ক্ষতি আছে।(ইকদুল জীদ ৩১পৃঃ)
হাদীস থেকে তাকলীদ শখসীর প্রথম প্রমান
ReplyDeleteহযরত ইকরিমা থেকে বর্ণিত যে,একদা মদীনা বাসীরা হযরত ইবনে আব্বাস (রযি)-কে জিজ্ঞাসা করলেন-যে মহিলারা(ফরয)তওয়াফের পর মাসিক এসে গেল,তার হুকুম কী? ইবনে আব্বাস(রযি.) তাদেরকে বললেনঃ এরুপ মহিলা(বিদায়ী তওয়াফ না করে মক্কা থেকে চলে যেতে পারে। উত্তর শুনে মদীনাবাসীরা বললেনঃ আমরা যায়েদ বিন সাবিতের(রযি.) উক্তি ছেড়ে আপনার কথার উপর আমল করবনা। প্রতুত্তরে হযরত ইবনে আব্বাস(রযি.)বললেনঃ তোমরা মদীনায় পৌছে(উম্মে সুলাইম,ও অন্যান্যদের)জিজ্ঞাসা করে নিও।(সহীহ বুখারী১/২৩৭ পৃঃ)
সহীহ মুসলিম ১/৪২৭ পৃষ্ঠায় হযরত ত্বউস(রঃ)-এর বর্ননায় আছে,পরিশেষে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত(রযি)বিষয়টি অনুসন্ধান করে ইবনে আব্বাস(রযি.)-এর কাছে এসে হাসতে হাসতে বললেনঃ আপনি ঠিকই বলেছিলেন।
উমদাতুল কারী৭/৩৮৬ পৃষ্ঠায় ১৭৫৮ নম্বরে এই হাদীসটির ব্যাখ্যায় আব্দুল ওহহাব সাকাফীর সুত্রে এও আছে অবশেষে মদীনাবাসীরা হযরত ইবনে আব্বাস(রযি.)-এর কাছে এসে বললেনঃ আপনি আমাদের যেমন শুনিয়েছিলেন,আমরা হাদীসটি তেমনই পেলাম।
মন্তব্যঃ উক্ত ঘটনা দ্বারা দুটি জিনিস বোঝা যায়ঃ(১)মদীনাবাসীরা নিদ্দিষ্টভাবে হযরত যায়িদ বিন সাবিত(রযি.)-এর রায়ের তকলীদ (অনুসরন)করতেন।সেই জন্যই তারা তার রায়ের মোকাবেলায় হযরত ইবনে আব্বাসের(রযি.) রায় প্রত্যাখ্যান করে দিলেন।অথচ ইবনে আব্বাস(রযি.)তাদেরকে নিজের রায়ের সাথে হাদীসও শুনিয়েছিলেন। (২) এ হাদীস দ্বারা এও বোঝা যায় যে, নিজের ইমামের রায়ের খেলাপ কোন হাদীস পাওয়া গেলে তাহকীক করে হাদীসের উপর আমল করা মুকাল্লিদের কর্তব্য।তবে এটা একমাত্র পন্ডিত আলিমের পক্ষেই সম্ভব। যার শর্তগুলি হযরত শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী(রহঃ) ইকদুল জীদ কিতাবে ৫৭ পৃষ্ঠায় উল্ল্যেখ করেছেন।